সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ভয়াবহ পরিস্থিতি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে। বুধবার রাওয়ালকোট, বাঘ, হাতিয়ান বালা, কোটলি, মিরপুর, সুধানোটি, ধীরকোট, দাদিয়াল এবং মুজাফফারাবাদসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বড় আকারের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত এই বিক্ষোভ চলে। রাত পর্যন্ত দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন।
গত সপ্তাহ থেকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত নাগরিক সমাজের জোট জেএএসি ইসলামাবাদের শাসনের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ পাকিস্তান সরকার ভিন্নমত দমন এবং শাসন, প্রতিনিধিত্ব ও মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষা করে আসছে। গত ৫ জুন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে অস্থিরতার ঢেউ শুরু হয়। বিদ্যুৎ ও গমের আকাশছোঁয়া দামের কারণে বিক্ষোভ আরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের কঠোর দমনপীড়নের পর আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ এবং পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ১০০ জনেরও বেশি আহত হন। তারপর থেকেই উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছিল। এরপর বুধবার পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয়। আন্দোলন জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৪ জন নেতার মাথার ওপর ১ কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার।
রাওয়ালকোট, বাঘ, হাত্তিয়ান বালা, কোটলি, মিরপুর, সুধনোটি, ধীরকোট, দাদিয়াল ও মুজাফফারাবাদ জুড়ে বিক্ষোভ চলছে। ব্যানার ও লাঠি হাতে বিশাল জনতা বৃহত্তর অধিকারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশ থেকে বিক্ষোভকারীরা রাওয়ালকোটে একত্রিত হবে। সেখান থেকে তারা মুজাফফারাবাদের দিকে পদযাত্রা শুরু করবে। সরকার পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর জুড়ে প্রধান সড়কগুলো বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভকারীদের মুজাফফারাবাদে যাওয়া আটকানোর চেষ্টা করেছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মুজাফফারাবাদের দিকে যাওয়া গাড়ি আটকাতে মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা সরকারের কাছে ৩৮টি দাবির একটা সনদ মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। বিক্ষোভের জেরে বেশ কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ ও দমন অভিযান শুরু করেছে পাক প্রশাসন।
আলোচনা শুরু করার পরিবর্তে পাকিস্তান সরকার আরও কঠোর দমননীতি গ্রহন করেছে। প্রশাসন ৪ জন প্রধান বিক্ষোভ সংগঠকের মাথার দাম এক কোটি পাকিস্তানি রুপি ঘোষণা করেছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা দায়ের করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘ভারতীয় এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগ নিয়ে আসা হয়েছে। যে অভিযোগ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী প্রায়শই সমালোচক, বিরোধী নেতা এবং মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে থাকে।
বিক্ষোভকারীর উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে অন্যতম নেতা সর্দার আমান খান বলেন, ‘হাসপাতাল, রুটি, চাকরি ও মৌলিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলনরত নিরস্ত্র জনগণকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ইসলামাবাদ সরকার সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করছে। বেলুচিস্তানের জনগণকে জিজ্ঞাসা করুন সন্ত্রাসী কারা। তারা সেনাবাহিনীর দিকে আঙুল তুলবে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণকে জিজ্ঞাসা করুন। তারাও একই কথা বলবে। সিন্ধু ও পাঞ্জাবকে জিজ্ঞাসা করুন, এবং আজ এমনকি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণও উচ্চস্বরে ও স্পষ্টভাবে বলছে: আসল সন্ত্রাস আসে উর্দিধারীদের কাছ থেকে। উর্দিধারীরাই এই সন্ত্রাসবাদের পেছনের শক্তি।
পাকিস্তান সরকারের দ্বারা কাশ্মীরিদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারত। দিল্লি এই মৃত্যুকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং বলেছে, এই ঘটনাটি ইসলামাবাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের জনগণের মৌলিক অধিকার ক্রমাগত অস্বীকার করার বিষয়টি উন্মোচিত করেছে। ভারত আরও আশা প্রকাশ করছে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সহিংসতার জন্য পাকিস্তানকে জবাবদিহি করবে এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণের অধিকারকে সম্মান করার জন্য দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।