সোমবারই বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে লড়াই করার জন্য আঙুলের ছাপ দিয়ে বগুড়া–৭ আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আর নির্বাচনে লড়া হল না খালেদা জিয়ার। দীর্ঘ রোগভোগের পর মঙ্গলবার সকালে মারা গেলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি–র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বাংলাদেশের স্থানীয় সময় সকাল ৬টা নাগাদ ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত একাধিক রোগে ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। যার মধ্যে ছিল লিভারের উন্নত সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস এবং বুক ও হৃদপিণ্ডের জটিলতা। শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাধিক দুর্নীতির দায়ে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠায়। জেলবন্দী থাকার সময়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। মুক্তি পাওয়ার পর চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হলেও নানা রোগে জটিলতা ও ধকলে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বয়সও ছিল প্রতিকূল। প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন এবং হাসপাতালে ভর্তি করানো হত।
২৩ নভেম্বর থেকে খালেদা জিয়াকে আবার ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হওয়ায় ১১ ডিসেম্বর তাঁকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। ২ দিন আগেই খালেদার ব্যক্তিগত চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। এবার আর চিকিৎসায় সাড়া দিলেন না। এক মাসের কিছু বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর দেশবাসীর কাছ থেকে চিরবিদায় নিলেন খালেদা জিয়া।
এক ফেসবুক পোস্টে বিএনপি জানিয়েছে যে, আজ সকাল ৬টা নাগাদ চিকিৎসকরা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে মৃত ঘোষণা করেছেন। পোস্টে বলা হয়েছে, ‘সোমবার রাত থেকে খালেদা জিয়ার অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাতার থেকে একটা বিশেষ বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কিন্তু মেডিকেল বোর্ড প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে স্থানান্তরের ছাড়পত্র দেয়নি।’ রবিবার তারেক রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালে অসুস্থ মাকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে ২ ঘন্টারও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন।
দু’দফায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন খালেদা জিয়া। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৯১ সালে। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব সামলান। আবার ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। আর বেনজির ভুট্টোর পর দ্বিতীয় মহিলা হিসেবে কোনও মুসলিম রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে বিএনপি গঠন করেন। ১৯৮১ সালের মে মাসে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়। ১৯৮৪ সালে খালেদা জিয়া বিএনপি চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন এবং তাঁর নেতৃত্বে দলটি এইচএম এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্রতর করে। ১৯৮২ সালে সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছিলেন এরশাদ। তাংর শাসনকালে জিয়াকে কমপক্ষে সাতবার আটক করা হয়েছিল।
তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে ১৯৯০ সালে এরশাদ পদত্যাগ করেন। যার ফলে পরের বছর একটা অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়। যেখানে জিয়া নির্বাচিত হন এবং দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন কিন্তু ব্যাপক ধর্মঘট ও বিক্ষোভের মুখে এক মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করেন। ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় বিএনপি ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করে।
এরপর ২০০১ সালে দ্বিতীয় দফায় আবার প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেন খালেদা জিয়া। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। ২০০৬ সালে পদত্যাগ তিনি করেন। পরের বছর দুর্নীতির অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ক্ষমতায় থাকাকালীন নারী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিল খালেদা জিয়া। বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করেছিলেন, দশম শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি এবং শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি পরিকল্পনা গ্রহন করেছিলেন। তাঁর প্রশাসন সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করেছিল।
নারীশিক্ষার প্রসারে খালেদা জিয়া সরকারের ভূমিকার কথা সকলেই স্বীকার করেন। তবে তাঁর আমলে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয় খালেদার। জেলবনদী থাকার সময় থেকেই বারবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জানুয়ারিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়া হয়েছিল। এবারও সেই রকম পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়ার শারীরিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে মোডিকেল বোর্ড ঝুঁকি নেয়নি।