গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিক্ষোভ রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সহিংসতা ও সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত ৫৩৮ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা কর্মী রয়েছে। ১০৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট মার্কিন এবং ইজরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে গত বছর ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মূল্য হ্রাস পায়। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের মূল্য ১.৪ মিলিয়ন রিয়ালেরও বেশি। প্রাথমিকভাবে বিক্ষোভগুলি মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় শাসনের প্রতি এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভিও জনগণকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান।
এই পরিস্থিতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সেনাবাহিনীকে কঠোর দমননীতি অনুসরণ করার নির্দেশ দেন। প্রথমে তেহরানে বিক্ষোভ শুরু হলেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ অব্যাহত। বাসে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। শনিবার রাতে গিশ জেলায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। বিক্ষোভকারীদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইরান আক্রমণের পরিকল্পনা করছেন।
এদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলকে প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ বলেছেন যে যদি আমেরিকা যদি ইরানে আক্রমণ করে, তাহলে ইজরায়েল এবং এই অঞ্চলে অবস্থিত সমস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, অন্যান্য ঘাঁটি এবং জাহাজকে আক্রমণ চালানো হবে। সংসদ সদস্যদের পার্লামেন্টের ভেতরে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান দিতে দেখা গেছে। কালিবাফ স্পষ্ট বলেছেন যে, ইরান প্রতিশোধ নেবে না, তবে কোনও হুমকি অনুভব করলে পূর্বনির্ধারিত হামলা চালাতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলতেই ইরানের পার্লামেন্ট থেকে এই বিবৃতি এসেছে। ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন যে, ইরান সম্ভবত আগের চেয়েও স্বাধীনতার কাছাকাছি এবং আমেরিকা সাহায্য করতে প্রস্তুত। নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্পের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে, যদিও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও সতর্ক করে দিয়েছে যে, ট্রাম্পের হুমকি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি পার্লামেন্টের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করে, যেখানে কালিবাফ পুলিশ এবং বিপ্লবী গার্ডের, বিশেষ করে বাসিজ বাহিনীর প্রশংসা করেছেন। ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেলও সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যারা বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করবে বা সহায়তা করবে তাদের ঈশ্বরের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হবে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে ইরান আক্রমণ করতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, আমেরিকা যদি পদক্ষেপ নেয় তাহলে ইজরায়েলও এই অভিযানে যোগ দেবে। ইজরায়েল ও আমেরিকা সম্ভাব্য ইরান আক্রমণ নিয়ে আলোচনাও করেছে।
আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ইরান সম্পর্কে একটা বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডেকেছেন। এই বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। সেই সময়ের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সমস্ত বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা হবে। এদিকে, নেতানিয়াহুও মঙ্গলবার ইরান নিয়ে একটা মন্ত্রিসভার বৈঠক করবেন। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্রমাগত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।