রাজ্যের শাসকদলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক–এর অফিস ও সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাসভবনে বৃহস্পতিবার হানা দেয় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টর (ইডি)। ইডি তল্লাশি অভিযান শুরু করতেই প্রতীক জৈনের বাড়িতে পৌঁছে যান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কলকাতার নগরপাল মনোজ ভার্মা৷ এরপর সেখান থেকে আইপ্যাকের সল্টলেকের অফিসেও পৌঁছে যান মমতা ব্যানার্জি। দুটি জায়গা থেকেই জোর করে তিনি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও কম্পিটার হার্ড ডিস্ক নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেছে ইডি। এই ব্যাপারে এই কেন্দ্রীয় সংস্থা আদালতের দ্বারস্থও হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ভোরে আইপ্যাকের সল্টলেক সেক্টর ফাইভের অফিসে হানা দেয় ইডি। দিল্লিতে নথিভুক্ত কয়লাপাচার সংক্রান্ত একটা পুরনো মামলার সূত্র ধরেই এই অভিযান চালায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। অভিযানের জন্য দিল্লি থেকে বিশেষ দল এসেছে। ইডির দাবি, কয়লাপাচার মামলায় একাধিক আর্থিক লেনদেনের সূত্রে আইপ্যাকের নাম উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় সেক্টর ফাইভে অবস্থিত আইপ্যাকের দফতরে অভিযান শুরু হয়। সেই সময় অফিসে নাইট শিফটের দু’জন কর্মী হাজির ছিলেন। তাঁদের সামনেই তল্লাশি শুরু হয়।
আইপ্যাকের অফিসে তল্লাশি করার পাশাপাশি সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাসভবনে হানা দেন ইডি আধিকারিকরা। খবর পেয়েই মুখ্যমন্ত্রী প্রতীক জৈনের বাসভবনে হাজির হন। ইডির তল্লাশি অভিযান চলার সময় তিনি সেখানে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন। এরপর প্রবীর জৈনের বাড়ি থেকে একটা সবুজ ফাইলে বিভিন্ন নথি ও হার্ড ডিস্ক নিয়ে বেরিয়ে যান। সেখান থেকে তিনি চলে যান আইপ্যাকের সল্টলেকের দফতরে৷ হাজির হন রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারও। তল্লাশির মাঝেই সেখান থেকেও বেশকিছু ফাইল নিয়ে এসে রাখা হয় মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে৷ অন্য একটা গাড়িতেও বেশ কিছু ফাইল নিয়ে রাখা হয়। পরে পুলিশি প্রহরায় সেই গাড়ি বেরিয়ে যায়।
ইডি–র পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তল্লাশি অভিযানের সময় দুটি জায়গাতেই উপস্থিত হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি জোর করে গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে চলে গিয়েছেন। পরে একটা প্রেস বিবৃতি জারি করে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোপ দাগে ইডি৷ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লি মিলিয়ে এদিন দশটি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়৷ এর মধ্যে ৬টি জায়গা ছিল পশ্চিমবঙ্গে৷ কলকাতায় তল্লাশির সময় কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে এসে তদন্তকারী আধিকারিকদের পরিচয়পত্র যাচাই করা হয়৷ সেখানে কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ কুমার ভার্মাও ছিলেন।
বিবৃতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধেও তোপ দেগেছে ইডি৷ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিপুল সংখ্যক পুলিশ কর্তাকে নিয়ে আসার আগে পর্যন্ত কাজ শান্তিপূর্ণ ও পেশাদারভাবে চলছিল। মমতা ব্যানার্জি প্রতীক জৈনের বাড়িতে আসেন এবং নথি ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নিয়ে চলে যান। এরপর মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি আইপ্যাকের কার্যালয়ে যায়৷ যেখান থেকে মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর সহযোগীরা এবং রাজ্য পুলিশের কর্মীরা জোরপূর্বক নথি ও ইলেকট্রনিক প্রমাণ সরিয়ে ফেলেন। এই পদক্ষেপ তল্লাশি অভিযানে বাধা সৃষ্টি করেছে৷’
এদিন সকাল ৬টা নাগাদ প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি অভিযান শুরু হয়। প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চলে৷ দুপুর ৩টে নাগাদ ইডির আধিকারিকরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান৷ এরপরই ইডি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়। শেক্সপিয়ার সরণি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন প্রতীক জৈনের স্ত্রী৷ ইডির বিরুদ্ধে তিনি বাড়ি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরির অভিযোগ দায়ের করেছেন৷ পুলিশের তরফেও এফআইআর দায়ের করা হয়েছে৷ অন্যদিকে, আইপ্যাকের অফিসে তল্লাশি নিয়ে বিধাননগর পুলিশের কাছেও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এই ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাজ্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার অনুমতি চায় ইডি৷ আগামিকাল এই মামলার শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে৷ আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদী এদিন বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আদালতের হস্তক্ষেপের আর্জি জানিয়েছেন৷ ইডির অভিযোগ, তল্লাশি ও তদন্ত চলাকালীন বাধা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি একজন সাংবিধানিক পদের অধিকারী হয়ে আইন লঙ্ঘন করেছেন৷ পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও নিয়ে এসেছে ইডি।