পরনে হালকা নীল শাড়ি। কোলে ‘দিব্যাং আর্টিসান–হ্যান্ড এমব্রয়ডারি’ পুরস্কার। হুইলচেয়ারে বসে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন। গর্বের হাসি। বিজয়ীনির হাসি। এই হাসি তাঁর মুখেই মানায়। সত্যিকারের সাহসের জীবন। প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ‘দিব্যাং আর্টিসান–হ্যান্ড এমব্রয়ডারি’ পুরস্কার জিতে নিলেন মণিপুরের প্রতিবন্ধী মহিলা ইয়েংখোম ইন্দিরা দেবী। নিজের বাসভবনে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু।
মণিপুরের কাকচিং জেলার বাসিন্দা ইয়েংখোম ইন্দিরা দেবীর সংগ্রামের গল্পটা একটু অন্যরকম। ২০১৪ সালে একটা গাড়ি ও বাসের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষে কোমরে চোট পান। একজন চালক ঘটনাস্থলেই মারা যান। ইন্দিরা দেবী গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এরপর টিউমারের কারণে অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ ক্রমশ অসার হয়ে পড়ে। পক্ষাঘাতের কারণে ইন্দিরা দেবী ৮০ শতাংশ অক্ষম হয়ে পড়েন। চলাচল করতে না পারায় তিনি শখের বশে রুমাল, বালিশ এবং বিছানার কভার বুননের মতো ছোট হাতের সূচিকর্মের কাজ শুরু করেন।
দ্বিতীয় দুর্ঘটনার ভারে ইন্দিরা দেবী সূচিকর্মের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ধীরে ধীরে তাঁর হস্তশিল্প চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। জাতীয় স্বীকৃতি আসার আগে ইন্দিরা দেবী তাঁর হস্তশিল্পের কাজের জন্য বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার পেয়েছিলেন, যার মধ্যে কাপড়ে জটিল সূচিকর্ম তৈরি জড়িত ছিল। তাঁর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ছিল ‘সাগোল কাংজেই’ বা পোলো খেলার একটা সূচি চিত্রকর্ম ।
এই শিল্পকর্মের ব্যাপারে ইন্দিরা দেবী বলেন, ‘আমি জেনেছি যে সাগোল কাংজেই প্রাচীনকালে মণিপুরে উৎপত্তি লাভ করেছিল এবং এখন এই খেলাটি সারা বিশ্বে জনপ্রিয়। আমি সাগোল কাংজেইয়ের একটি সূচিশিল্প করেছি।’ ইন্দিরা দেবীর সূক্ষ্ম সূচিকর্মের কাজে দেখা গেছে, মেইতেই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোলো পোশাক পরা তিনজন পুরুষ তাদের স্থানীয় পোনিতে চড়ে সর্বোচ্চ শক্তির জন্য উঁচুতে দুলিয়ে বল মারার প্রতিযোগিতা করছেন। রঙগুলি প্যাস্টেল এবং দূরে একটা পাহাড়ের পটভূমি স্পষ্টতই মণিপুরের মতো। কাজটি সম্পন্ন করতে পাঁচ মাস সময় লেগেছে বলে জানান ইন্দিরা দেবী।
দুই ভাই এবং চার বোনের মধ্যে পঞ্চম সন্তান ইন্দিরা দেবী। তাঁর বাবা ক্ষেত্রিমায়ুম ইবোয়িমা সিং কাঠের মিস্ত্রি ছিলেন। ছুতোর দক্ষতার জন্য যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন তিনি। কাঠের শিল্পে রাষ্ট্রীয় পুরষ্কারও জিতেছিলেন ইবোয়িমা সিং। উত্তর প্রদেশের লখনউয়ের বিখ্যাত হিন্দুস্তানি সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান ভাতখণ্ড সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন ইন্দিরা দেবী। তিনি একটা দল গঠন করার এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন, যারা শখ হিসেবে বা জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে হস্তশিল্প শিখতে চান।
২০২৩ এবং ২০২৪ সালের জন্য জাতীয় হস্তশিল্প পুরস্কার প্রাপকদের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কারিগরদের সঙ্গে ইন্দিরা দেবীও ছিলেন। তিনি ছাড়াও মণিপুরের আরো ২ জন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে জাতীয় হস্তশিল্প পুরস্কার পেয়েছেন। বাকি দুজন হলেন লাইশরাম মেমিচা এবং এ বিমলা দেবী। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তুলে ধরেন যে, হস্তশিল্প কেবল ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরই একটা অংশ নয়, বরং জীবিকার একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎসও। তিনি বলেন,‘এই খাতে ৩২ লক্ষেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে। হস্তশিল্প থেকে কর্মসংস্থান এবং আয়ের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করে। এই খাত কর্মসংস্থান এবং আয়ের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে উৎসাহিত করে।’