ট্রেন্ডিং

Online Fantasy Sports

স্বপ্নের দল তৈরি করতে করতে আসল খেলাটাই চলে যাচ্ছে দুঃস্বপ্নের অন্তরালে

একটা সময় ছিল যখন ক্রিকেট মানেই বিকেলের মাঠ, ব্যাটে–বলের লড়াই, বাবা–ছেলের মধ্যে বীরেন্দ্র শেহবাগ বনাম ব্রেট লি নিয়ে যুক্তিতর্ক। সময় বদলেছে। মাঠ বদলে গেছে মোবাইল স্ক্রিনে। খেলার অনুভূতিও হয়েছে ডিজিটাল। বাংলার গলিপথ থেকে শুরু করে মহানগরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, সর্বত্র এখন বেটিং অ্যাপের ছোঁয়া। Dream11, MPL, Zupee, 1xBet, RummyCircle–এর মতো অ্যাপগুলির তালিকা যেন আর থামতেই চায় না। একদিকে খেলা, আর অন্যদিকে খেলার ওপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

মাঠ বদলে গেছে মোবাইল স্ক্রিনে।

রুপালী দলুই

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
Share on:

একটা সময় ছিল যখন ক্রিকেট মানেই বিকেলের মাঠ, ব্যাটে–বলের লড়াই, বাবা–ছেলের মধ্যে বীরেন্দ্র শেহবাগ বনাম ব্রেট লি নিয়ে যুক্তিতর্ক। সময় বদলেছে। মাঠ বদলে গেছে মোবাইল স্ক্রিনে। খেলার অনুভূতিও হয়েছে ডিজিটাল। বাংলার গলিপথ থেকে শুরু করে মহানগরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, সর্বত্র এখন বেটিং অ্যাপের ছোঁয়া। Dream11, MPL, Zupee, 1xBet, RummyCircle–এর মতো অ্যাপগুলির তালিকা যেন আর থামতেই চায় না। একদিকে খেলা, আর অন্যদিকে খেলার ওপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ঝুঁকি।

‘‌ধোনি কি খেলবে?’‌, শহরের গলিতে এখন আর শুধু এই প্রশ্ন ওঠে না। বরং, ‘‌ধোনিকে ক্যাপ্টেন করব, না কেএল রাহুলকে?’‌ এই নিয়ে চর্চা এখন মাঠ কিংবা মাঠের বাইরে সর্বত্রই। খেলোয়াড়ের পারফরমেন্স এখন শুধুই পয়েন্ট নয়, তা সরাসরি অর্থমূল্যেও পরিণত হয়েছে। এই ফ্যান্টাসি গেমগুলির মৌলিক ব্যাকরণটা হল, খেলোয়াড়রা নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়দের নিয়ে একটা ভার্চুয়াল দল তৈরি করেন এবং সেই খেলোয়াড়দের বাস্তব মাঠের পারফরমেন্সের ভিত্তিতে পয়েন্ট লাভ করেন। এই পয়েন্টই টাকা বা পুরস্কার জেতার প্রধান মাপকাঠি। ফলে, এক ব্যাটার একটা ছক্কা মারলে কেউ হারায় কয়েকশো টাকা, আবার কেউ রাতারাতি হয়ে ওঠে ‘অ্যাপ মিলিয়নেয়ার’। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এটা কি সত্যিকারের ক্রীড়া ভালবাসা, নাকি মোহগ্রস্ত এক বাজির সংস্কৃতি?

গেমিং অ্যাপগুলির তালিকা এক নিঃশ্বাসে পড়া না গেলেও, এক আঙুলে ঘোরে সব। মোবাইলের মেমোরিতে যতটা না জায়গা নেয় এরা, তার থেকেও বেশি নিয়ে নিচ্ছে মনে জায়গা। 

স্কুলের ছেলেটা, যার এখনও ম্যাচের নিয়ম ভাল করে জানা নেই, সে এখন জানে কোন অ্যাপে আজ নতুন অফার আছে, কার পয়েন্টিং সিস্টেম কেমন। এই প্ল্যাটফর্মগুলিতে প্রায়শই ‘কম ট্রাফিক’ বা কম অংশগ্রহণকারী থাকলেই বেশি লাভ হওয়ার একটা ধারণা ছড়ানো হয়, যা আদতে আরও বেশি ব্যবহারকারীকে প্রলোভিত করে। ব্যাটার ছক্কা মারলে তার দল জেতার সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু ফোন হাতে দল গড়া ফ্যান্টাসি গেমারের লাভ হবে কি লোকসান, তা কেবলই বাণিজ্যিক ক্যালকুলেশন।

এখানেই আইনি জটিলতা। Dream11 এর মতো ফ্যান্টাসি প্ল্যাটফর্মকে গ্যাম্বলিং বা বাজির আওতায় রাখা হবে কিনা, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এর আগে একাধিক রায়ে এই ধরনের ফ্যান্টাসি স্পোর্টসকে ‘Skill’ বা দক্ষতার খেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, গ্যাম্বলিং বা ‘Chance’-এর খেলা হিসেবে নয়। এই আইনি প্রেক্ষাপটই কোম্পানিগুলিকে নিজেদের কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই এই অনলাইন গেমের অভ্যাসকে মানসিক অসুখের সঙ্গে তুলনা করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি পাঁচজন গেমারের মধ্যে এক জন ভারতীয়। আশ্চর্য নয়, শিক্ষা এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে জর্জরিত এ দেশের যুব সম্প্রদায় এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনলাইন গেমের নেশা মাদকের মতো বিস্তার লাভ করেছে। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি (CMIE)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২৩ সালে ভারতে গড় বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৭–৮ শতাংশ, যা যুবসমাজের একটা বড় অংশকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিয়েছে।

নিজেকে সুরক্ষিত রাখার উপযোগী ডিজিটাল শিক্ষা এদের নেই। ইতিমধ্যে অনেকেই কম সময়ে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে পা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। কেবল মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নয়, এই নাগরিক সংকট আসলে একটা ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। পাশাপাশি, অ্যাপগুলি বহু তারকা খেলোয়াড়কে দিয়ে যে বিজ্ঞাপন করাত, সেই ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার প্রশ্নও এখানে রাখা জরুরি। সাম্প্রতিককালে, টোলপ্লাজাগুলিতে ই–টোকেন (E-Token) ব্যবহার করে দ্রুত লটারি বা বাজির প্রচারও শুরু হয়েছিল, যা নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে আরও সহজে বাজির সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়েছে।

এই দৃশ্যপটেই ২০২৫ সালে কার্যকর হল এক নতুন কাঁটা, ‘অনলাইন গেমিং প্রচার ও নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৫’। সংসদে পাস হওয়া এই আইন স্পষ্ট করে বলছে, খেলা হোক খেলা, তা যেন না হয় ক্যাসিনোর বিকল্প। আইনটি মূলত বেটিং ও জুয়াকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি গেমিং প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে লাইসেন্স, ব্যবহারকারীর সুরক্ষা এবং কড়া করের বিধান রেখেছে। 

তবে বেটিং কোম্পানিগুলো তো আর এত সহজে হার মানবে না! আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে আবারও তারা হাজির হচ্ছে অন্য নামে, অন্য ফর্ম্যাটে। উদাহরণস্বরূপ, বহু অ্যাপ এখন সরাসরি বাজির বদলে ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি–ভিত্তিক’ গেমিং শুরু করে দিয়েছে, যেখানে প্রচলিত ব্যাঙ্কিং চ্যানেলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বিজ্ঞাপনের ভাষা বদলেছে। ‘বাজি’ শব্দটা আজ অদৃশ্য, তার বদলে এসেছে ‘‌ফ্যান্টাসি টিম বানিয়ে জেতো’‌ বা ‘‌কৌশল আর জ্ঞানের খেলা’‌। এখানেই প্রশ্ন, স্বপ্নের দল তৈরি করতে করতে আমরা কি আসল খেলাটাকেই দুঃস্বপ্নে ঠেলে দিচ্ছি না?

আরও পড়ুনঃ

অন্যান্য খবর

Inside Bangla is a comprehensive digital news platform. This web portal started its humble journey. Its courageous journalism, presentation layout and design quickly won the hearts of people. Our journalists follow the strict Journalism ethics.

Copyright © 2026 Inside Bangla News Portal . All Rights Reserved. Designed by Avquora