ইরানের বিরুদ্ধে আবার নতুন করে সামরিক আঘাত হানার হুমকি দিয়েচেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তেহরান শান্তি চুক্তিতে রাজি না হলে মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর কঠোর আঘাত হানবে। একই সঙ্গে তিনি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজগুলিকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য মার্কিন অভিযানের কথাও জানিয়েছেন।
বুধবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার ইরানের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি এবং আজকেও কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি।’ ট্রাম্পের এই বক্তব্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা ইরানের ওপর খুব কঠিন হামলা চালাব। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া এড়ানোর সুযোগ ইরানের সামনে এখনও আছে।’ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এখনই একটা চুক্তিতে স্বাক্ষর করুক ইরান।’
ট্রাম্প একটা গোপন মার্কিন সামরিক অভিযানের বিশদ বিবরণও প্রকাশ করেছেন, যেটিকে তিনি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল রক্ষা এবং বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে বিঘ্ন রোধ করার লক্ষ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী নীরবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলিকে পাহারা দিয়ে আসছিল। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আজই প্রথম ঘোষণা করছি, কিন্তু আমরা প্রতি রাতে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল উত্তোলন করে আসছি।’ তিনি দাবি করেন, চলমান সংঘাত সত্ত্বেও এই অভিযান বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তি দিয়েছেন যে, মার্কিন হস্তক্ষেপ ছাড়া তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারত। তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করা হয়েছে, আর সে কারণেই এর দাম ব্যারেলপ্রতি ২৫০ ডলারের পরিবর্তে ৮৫-৯০ ডলার হয়েছে।’ ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনী রাতের আঁধারে সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে কয়েক ডজন জাহাজকে এসকর্ট করে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা গভীর রাতে আলোবিহীন ২২টি জাহাজ ধ্বংস করেছি, কারণ তাদের কোনও রাডার ছিল না। আমরা সেগুলোকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছি।’
আরও পড়ুনঃ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ভয়াবহ পরিস্থিতি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে, দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ রাস্তায়
ট্রাম্প যখন তাঁর চিরাচরিত ভঙ্গিতে হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান যে কোনও চাপ বা হুমকির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়াবে। এক্স–এ দেওয়া এক পোস্টে পেজেশকিয়ান গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ‘জাতির প্রাণশক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং প্রধান বেসামরিক খাতগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকির নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো জনগণের জীবনরেখা।’ পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ‘পরিবহন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ও জল শিল্পগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং একটা জাতির দৃঢ় সংকল্পের মুখে হতাশার লক্ষণ।’
পেজেশকিয়ান বলেছেন, বাহ্যিক চাপ মোকাবেলায় ইরান অভ্যন্তরীণ দক্ষতা ও জাতীয় ঐক্যের ওপর নির্ভর করবে। তিনি বলেন, ‘ইরান তার বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও সক্ষমতা, জাতীয় ঐক্য এবং সংহতির ওপর নির্ভর করে যে কোনও চাপ বা হুমকির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়াবে।’
এদিকে, রাতভর পাল্টাপাল্টি হামলার পর তেহরানও বলেছে যে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা পুনর্বিবেচনা করবে। সংঘাতপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জর্ডন, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির কাছে ইরান একটা মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে বলে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর এই গোলাগুলির ঘটনাটি ঘটে, যা এপ্রিলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে চুক্তির পর অন্যতম উল্লেখযোগ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আমেরিকান হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ভূমি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং নজরদারি রাডার সাইটগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল এবং তারা এই হামলাকে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ‘আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার মাত্র কয়েক দিন পরেই এই উত্তেজনা বৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের চুক্তির সম্ভাবনার ওপর নতুন করে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।