লিওনেল মেসির কলকাতা সফর ঘিরে শনিবার যুবভারতীতে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য গ্রেফতার করা হয় মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে। আজ বিধাননগর মহকুমা আদালতে তাঁকে তোলা হলে সরকারি পক্ষের আইনজীবী ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের আবেদন জানান। তাঁর সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন বিচারক। ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। শতদ্রু দত্তর আইনজীবী অবশ্য জামিনের আবেদন জানাননি।
শনিবার মেসির সঙ্গে হায়দরাবাদ উড়ে যাওয়ার সময় কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয় শতদ্রু দত্তকে। তাঁর বিরুদ্ধে মেসির অনুষ্ঠান ঘিরে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বিধাননগর পুলিশ। ভারতীয় সংহিতার আটটি ধারায় মামলার রুজু করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর রাতেই শতদ্রু দত্তকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে বিধাননগর পুলিশ। রবিবার তাঁকে বিধাননগর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়।
শতদ্র দত্তকে যখন বিধাননগর মহাকুমা আদালতে নিয়ে আসা হচ্ছিল, সেই সময় তুমুল বিক্ষোভ দেখায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। শতদ্রু দত্তকে দেখা মাত্রই তাঁর উদ্দেশ্যে ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়। ভিড়ের মাঝেই প্রবল নিরাপত্তার বেষ্টনীতে শতদ্রু দত্তকে মুখ ঢাকা অবস্থায় আদালতের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়।
আদালতে শুনানির সময় সরকারপক্ষের আইনজীবী বিচারকের কাছে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের জন্য আবেদন জানান। শতদ্রু দত্তর আইনজীবী অবশ্য জামিনের আবেদন জানাননি। তিনি আদালতকে বলেন, যুবভারতীর বিশৃঙ্খলার জন্য মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত কোনও ভাবেই দায়ী নন।
আইনজীবীর মাধ্যমে শতদ্রু আদালতকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে। কিন্তু কে দোষ করেছে? আমি কোনও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করিনি।’ শতদ্রুর বিরুদ্ধে ‘মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার’ আইনে মামলা রুজু হয়েছে। আদালতে এই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর আইনজীবী। শতদ্রু বলেন, ‘আমি কী করেছি যে এই আইনে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে?’ এরপরই শতদ্রু আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে বলেন, ‘আমি এক জনকে নিয়ে এসেছি, যিনি শিক্ষা দেবেন। বাচ্চাদের দেখাবেন। স্টেডিয়ামে কী হয়েছে, তার জন্য আমার বিরুদ্ধে কেন মামলা হবে? ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজত কেন চাওয়া হচ্ছে?’
সরকারি পক্ষের আইনজীবী আদালতকে পাল্টা বলেন, ‘মেসির সামনে কে যাবেন, কে যাবেন না, তার দায়িত্ব আয়োজকেরই। তিনি নিজের লোকদের নিয়ে এমন ঘিরে ছিলেন, যে বাকি লোকেরা দেখতে পাননি। মেসিকে দেখতে হাজার হাজার টাকার টিকিট কেটেছিলেন দর্শকেরা। কিন্তু অনুষ্ঠানের পুরো সময়টায় ফুটবল তারকাকে ঘিরে ছিলেন আয়োজক এবং রাজ্যের নেতা–মন্ত্রীরা। মেসি যখন মাঠে প্রবেশ করেন, তখন এদিক থেকে ওদিকে যাওয়া-আসা করছিলেন লোকজন। দর্শকেরা মাঠ থেকে দেখতে পাননি।’ সরকারি আইনজীবী ১০টি কারণ দেখিয়ে শতদ্রুকে পুলিশে হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানান। সেই আবেদন মঞ্জুর করেন বিচারক।
আদালত থেকে বেরিয়ে শতদ্রুর আইনজীবী বলেন, ‘যে সব কারণে পুলিশ আমার মক্কেলকে হেফাজতে চেয়েছে, তার জন্য ১৪ দিন রাখার দরকার নেই। ঘটনাস্থলের কাছেই থাকবেন আমার মক্কেল। আমার মক্কেল মেসিকে রাজ্যে নিয়ে এসেছিলেন একটা মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। বাংলার খুদে ফুটবলারেরা যাতে তাঁর থেকে শিখতে পারেন, সেটাই ছিল উদ্দেশ্য। আমার মক্কেলকে ভিকটিমাইজ করা হয়েছে।’
যুবভারতীতে যে বিশৃঙ্খলার তদন্ত করার জন্য যে কমিটি করা হয়েছে, সেই কমিটি রবিবার যুবভারতী পরিদর্শন করেন। কমিটিতে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ। কমিটির প্রধান প্রাক্তন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়। এদিন এই কমিটি যুবভারতীতে পৌঁছে প্রথমেই মাঠ পরিদর্শন করেন। স্টেডিয়ামের মাঠ পরিদর্শনের সময় ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ার, বেঁকে যাওয়া ব্যারিকেড এবং আবর্জনায় ভরা গ্যালারি খুঁটিয়ে দেখেছে ৷ মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ এবং স্বরাষ্ট্রসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী গতকাল অনুষ্ঠানের প্রবেশপথের করিডোর, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংলগ্ন গ্যালারিগুলোও পরিদর্শন করেন ৷ আজ আধিকারিকরা তদন্তের জন্য ভাঙচুরের পরিমাণের প্রমাণ সংগ্রহ করেন ও পুরো পরিদর্শনজুড়ে ভিডিও এবং ফটোগ্রাফি করেন৷ পাশাপাশি, এরকম ধরনের উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলিতে আর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে তারও ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কমিটিকে।