বুধবার এক বিরল দৃশ্যের সাক্ষী থাকল দেশের শীর্ষ আদালত। এসআইআর বিতর্কে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। স্বাধীনতার পর দেশে এই প্রথম কোনও মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করলেন। মমতা ব্যানার্জির আর্জি মেনে তাঁকে সওয়াল করার সুযোগ দেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। আর সওয়াল করার সুযোগ পেয়ে প্রধান বিচারপতিকে কৃতজ্ঞতা জানান মমতা ব্যানার্জি।
রাজ্যের ভোটার তালিকার এসআইআর সংক্রান্ত এক মামলায় ১ নম্বর কোর্টে ৩৭ নম্বর শুনানিতে হাজির হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী, বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হয়। সাদা শাড়ি ও কালো ওড়না পরে মমতা সকাল ১০টা নাগাদ আইনজীবীদের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছান। সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ ব্যানার্জিও।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সুপ্রিম কোর্টে প্রবেশের জন্য আগেই রেজিস্ট্রারের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তাঁর সেই আবেদন মঞ্জুরও করা হয়েছিল। তবে তিনি শুনানিতে অংশ নেবেন কিনা, আগাম কিছু জানাননি। আদালতে ঢুকে মমতা তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে প্রবেশ করেন এবং দর্শকদের জন্য নির্দিষ্ট সারির একটা চেয়ারে বসেন। দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিট নাগাদ যখন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্জ শুনানি শুরু করেন, তখন আইনজীবীদের জন্য নির্ধারিত চেয়ারের প্রথম সারিতে গিয়ে বসেন মমতা ব্যানার্জি।
প্রথম দিকে মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান তাঁর পক্ষে সওয়াল করেন। কিছুক্ষণ পর মমতা ব্যানার্জি নিজে সওয়াল করার জন্য বেঞ্চের কাছে অনুমতি চান। তিনি বেঞ্চের কাছে আবেদন করেন, ‘আমি কি একটু ব্যাখ্যা করতে পারি?’ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তাঁর সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। এরপর আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মমতা বলেন, ‘আমি এই রাজ্যের মানুষ। আপনাদের সদয়, তাই আজ এখানে উপস্থিত হতে পেরেছি। বেঞ্চের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, বিরোধী পক্ষের আইনজীবীদের প্রতিও আমার নম্র প্রণাম জানাচ্ছি।’
মমতা ব্যানার্জির সওয়ালে সৌজন্য এবং সংযমের আড়ালে উঠে আসে হতাশা। তিনি বলেন, ‘সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সবকিছু শেষ হয়ে যায়, অথচ ন্যায় মেলে না। যখন ন্যায় দরজার আড়ালে কাঁদে। তখনই মনে হয়, কোথাও আমরা ন্যায় পাচ্ছি না।’ তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনকে একাধিক চিঠিও লিখেছেন। মমতা অবশ্য আদালতকে স্পষ্ট করে জানান, ‘আমি খুবই নগণ্য একজন মানুষ। আমি এখানে আমার দলের জন্য লড়ছি না।’ জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নিজ অধিকারেই একটা আবেদন দায়ের করেছে। এরপর সওয়াল জবাব চলতে থাকে।
এদিন মমতা ব্যানার্জি কমিশনের বিরুদ্ধে রাজ্যে মাইক্রো অবর্জাভার নিয়োগ থেকে শুরু লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি, বিয়ের পর মেয়েদের পদবির পরিবর্তন ও তা নিয়ে সমস্যার কথা তুলে ধরেন৷ দেশের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের সামনে তিনি পরিস্কার সওয়াল করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যকে নিশানা করছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার৷ তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গকে নিশানা করা হচ্ছে৷ অসমে কেন এসআইআর হচ্ছে না?’ শীর্ষ আদালত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করুক এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা করুক৷ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘যোগ্য ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় থাকা উচিত।’
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বেঞ্চকে জানান, ‘৫৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে৷ এদিকে তাঁদের আবেদন জানানোর কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি৷ শুধু বাংলাকেই টার্গেট করা হয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বুলডোজ করার জন্য৷ লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যান্সিতে যেন নাম বাদ দেওয়া না হয়৷ মাইক্রো অবজারভার নয়, জেলা আধিকারিক এবং ইআরও সেগুলির সমাধান করুন৷’
মাইক্রো অবজারভার প্রসঙ্গে মমতা ব্যানার্জি, ‘মাইক্রো অবজারভাররাই সব করছে৷ বিজেপি শাসিত রাজ্য থেকে ৮৩০০ মাইক্রো অবজারভার আনা হয়েছে৷ তাঁরা নাম বাদ দিয়ে দিচ্ছে৷ ইআরওদের হাতে কোনও ক্ষমতা নেই৷’ এজলাসে নির্বাচন কমিশনকে ‘হোয়াটসঅ্যাপ কমিশন’ বলে উল্লেখ করেন মমতা। নাম বাদ যাওয়ার পর ৬ নম্বর ফর্মটি পূরণ করে নতুন করে নাম তোলার আবেদন করতে দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ মামলাটি পরবর্তী শুনানি হবে ৯ ফেব্রুয়ারি।