শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ার মধেই আবার অশান্ত মণিপুর। হিংসায় বাস্তুচ্যুত হয়ে দীর্ঘ ২ বছর ধরে ত্রাণ শিবিরে কাটানো মানুষ বাড়ি ফিরেও স্থায়ী হতে পারলেন না। আবার গুলি চালানোর ঘটনা। বাস্তুহীন মানুষদের পুনরায় ফিরে যেতে হল ত্রাণ শিবিরে। ঘটনাটি ঘটেছে মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলার তোরবাংয়ে।
২ বছরেরও বেশি সময় ধরে ত্রাণ শিবিরে বসবাসকারী শত শত মানুষ পুলিশ প্রহরায় সোমবার বিষ্ণুপুর জেলার পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত নিজেদের গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও তাদের সঙ্গে ছিলেন। গ্রামবাসীদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে প্রশাসনের কর্তারা ফিরে যান। কিন্তু কিছু নিরাপত্তারক্ষী ওই গ্রামে মোতায়েন ছিল। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ গ্রাম লক্ষ্য করে পাহাড় থেকে গুলি চালানো হয়। পাহাড়ের দিক থেকে প্রথম গুলির শব্দ আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাল্টা কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। যদিও এতে কেউ আহত হয়নি।
যদিও কোনও গোষ্ঠী বা ব্যক্তি এই গুলি চালানোর দায় স্বীকার করেনি। তবে মেইতেই সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন যে, কুকি বন্দুকধারীরা তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে ভয় দেখানোর জন্যই গুলি চালিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছেন, বুধবার সকালে তারা তাদের জমিতে ছোট ছোট গর্ত দেখতে পান যেখানে অপরিশোধিত মর্টার রাউন্ড (স্থানীয়ভাবে পাম্পি নামে পরিচিত) পড়েছিল। মণিপুর পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, মঙ্গলবার রাতে তোরবাংয়ে কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় একটা এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। বিষ্ণুপুরের এই গ্রামটি চুরাচাঁদপুরের আন্তঃজেলা সীমান্তের কাছে অবস্থিত। এই অঞ্চলে কুকি উপজাতিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ২০২৩ সালে জাতিগত সংঘাতে এই অঞ্চলে তীব্র সংঘর্ষ দেখা দেয়।
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ২ দিনের মণিপুর সফর এবং রাজ্যে শান্তি, সমঝোতা এবং পুনর্মিলনের জন্য তাঁর আবেদনের মাত্র কয়েকদিন পরেই এই গুলি চালানোর ঘটনাটি ঘটল। মেইতেই এবং কুকি নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলি বিবৃতিতে পরিস্থিতি তৈরির জন্য একে অপরের সম্প্রদায়কে দায়ী করেছে। কুকি জো কাউন্সিল যে কোনও সম্প্রদায়ের কেউ বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে তাদের পৃথক প্রশাসনের দাবির সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।
মেইতেই অ্যালায়েন্স, মেইতেই হেরিটেজ সোসাইটি এবং রাজ্যের মেইতেই নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলির শীর্ষ সংস্থা ‘কোকোমি’ কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনে এবং রাষ্ট্রপতি শাসনের মধ্যে দায়মুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। মেইতেই নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলি জানিয়েছে, মণিপুর পুলিশের বিবৃতিতে, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির নির্বিচারে গুলি চালানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এবং এই বিষয়ে দায়ের করা এফআইআর থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে পাহাড়ের চূড়া থেকে কারা গ্রামবাসীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল।
মণিপুর থেকে পৃথক ‘কুকিল্যান্ড’ তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনায় থাকা কুকি–জো কাউন্সিল বলেছে যে, মেইতেই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের পক্ষে বিষ্ণুপুরের জেলা প্রশাসকের সমর্থন দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং উস্কানিমূলক। কুকি–জো কাউন্সিলের মুখপাত্র গিনজা ভুয়ালজং বলেছেন, ‘একতরফা প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং বাফার–জোন প্রোটোকল লঙ্ঘনের ফলে সৃষ্ট উত্তেজনার জন্য কুকি–জো সম্প্রদায়কে দোষারোপ করার যে কোনও প্রচেষ্টা কুকি–জো কাউন্সিল প্রত্যাখ্যান করে। শান্তি কেবল রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমেই আসবে। ভারত সরকারকে এই বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে যে কুকি•জো জনগণকে মণিপুর থেকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং তাদের জন্য একটা পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে, যা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য।’ অন্য কোনও কুকি সংগঠন এই ঘটনার বিষয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি।
মেইতেই সম্প্রদায়ের একটি প্রভাবশালী সংগঠন মেইতেই অ্যালায়েন্স এক বিবৃতিতে বলেছে যে, এই ঘটনাটি একটি বিপজ্জনক সংকেত পাঠিয়েছে যে সশস্ত্র চরমপন্থী বাহিনী কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনেও দায়মুক্তির সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং শান্তি ঘোষণাগুলি বাস্তবে প্রয়োগ না করা পর্যন্ত অর্থহীন থেকে যায়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এই আক্রমণটি ছিল ইচ্ছাকৃত, সংগঠিত এবং পূর্বপরিকল্পিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। যা ভয় দেখানোর জন্য এবং পুনর্মিলন যাতে না হয় এবং বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের তাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ থেকে সহিংসভাবে বিরত রাখার স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছিল।’