দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে অসমের তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিল পড়ুয়ারা। দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে আসছেন না উপাচার্য। পড়ুয়াদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে থেকে উপাচার্য দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারবেন না। দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে উপাচার্য শম্ভু নাথ সিংয়ের বিরুদ্ধে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পড়ুয়ারা।
অসমের শোণিতপুর জেলায় অবস্থিত এই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ২৯ নভেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাসে সব ধরণের শিক্ষা কার্যক্রমসহ যাবতীয় পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমস্ত পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় অশিক্ষক কর্মচারী সমিতি, তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ফোরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। ফলে বিগত চার–পাঁচদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে গেছে।
২২সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন উপাচার্য শম্ভু নাথ সিং। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, উপাচার্য ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। তারপর থেকে তিনি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখেননি। তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ফোরামের এক ছাত্র নেতা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘৩ মাস ধরে আমাদের বিক্ষোভ চলছিল। কিন্তু এখনও কোনও নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই, আমরা আমাদের আন্দোলন তীব্র করে তুলেছি এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছি। ছাত্র, অনুষদ এবং অশিক্ষক কর্মীরা একটা দাবিতে অনড়, পলাতক উপাচার্যকে অবিলম্বে বরখাস্ত করতে হবে।’
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছিল যে, উপাচার্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাংস্কৃতিক আইকন জুবিন গর্গের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাচ্ছে না, যদিও রাজ্য তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছে। পরে শোণিতপুর জেলা প্রশাসন জুবিন গর্গকে অসম্মান করার অভিযোগে তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেয়। উপাচার্যের কার্যকারিতা সম্পর্কিত অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য অসমের রাজ্যপাল কর্তৃক গঠিত একটা অনুসন্ধান কমিটিও বিষয়টি তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে। পড়ুয়াদের দাবি, রাজ্যপালের ফ্যাক্ট–ফাইন্ডিং কমিটি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কমিটির তদন্ত রিপোর্ট অবিলম্বে প্রকাশ করতে হবে। স্থগিতাদেশ, স্বচ্ছতা এবং সম্পূর্ণ জবাবদিহি না পাওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকবে।
আরও পড়ুনঃ সিবিআই তদন্তের মতোই অশ্বডিম্ব প্রসব করবে এসআইআর
আরও পড়ুনঃ তালিবানদের নৃশংসতার ভয়াবহ ছবি, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড, সরকারের আহ্বানে প্রত্যক্ষ করতে হাজির ৮০ হাজার মানুষ
দাবি ও আন্দোলনকে সমর্থন করে টিইউটিএ সভাপতি কুসুম কুমার বানিয়া বলেন, ‘প্রায় দেড় মাস আগে একটা অনুসন্ধান কমিটি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা প্রতিনিধি দল ক্যাম্পাস পরিদর্শন করলেও গত ৭৪ দিন ধরে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। এই সময়কালে আমাদের শিক্ষার্থীরা ৭০ দিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। অসাধারণ সংযম এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। তবে তারা কতক্ষণ অপেক্ষা করতে পারে তার একটা সীমা রয়েছে। এটা এমন একটা বিষয়, যা সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ক্যাম্পাসে উপাচার্যের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরা চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছেন।’ ্
এর আগে, অসমের রাজ্যসভার সদস্য অজিত কুমার ভূঁইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং উল্লেখ করেন যে, অসম চুক্তির ফলাফল হিসেবে ১৯৯৪ সালে সংসদের এক আইনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন যে, ‘ছাত্ররা ধর্না ও বিক্ষোভ করছে। অচলাবস্থা নিরসনের জন্য কোনও আন্তরিক প্রচেষ্টা করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ ও নীরব অনুমোদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে না থাকা উপাচার্য কেবল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে থেকে দায়িত্ব এড়াতে পারবেন না।’
প্রশাসনিক প্রধানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিদ্রোহের কারণে পরীক্ষার সময়সূচী আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই ধরণের ঘটনা প্রথম ঘটল। এই আন্দোলন চলাকালীর কমপক্ষে ১১ জন অনুষদ সদস্য এবং কর্তা পদত্যাগ করেছেন। যার মধ্যে পিআরও সমরেশ বর্মণও রয়েছেন। সর্বশেষ পদত্যাগকারী ব্যক্তি হলেন অর্থ–সচিব ব্রজবন্ধু মিশ্র। এছাড়াও পদত্যাগকারীদের মধ্যে রয়েছেন ইনচার্জ রেজিস্ট্রার, বেশ কয়েকজন ডিন, পরিচালক এবং সহকারী ডিন।