ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে জ্বলছে ইরান। প্রায় সপ্তাহব্যাপী ধরে চলা বিক্ষোভ নতুন বছরের শুরুতেই হিংসাত্মক চেহারা নিয়েছে। বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন নিহত। আহতের সংখ্যাও অনেক। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী রয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্যও নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অসংখ্য বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।
বিগত ৩ বছরের মধ্যে ইরানে এটাই সর্ববৃহৎ বিক্ষোভ। ইরানে অর্থনৈতিক অবনতির প্রতিবাদ ও ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে রাস্তায় নেমেছে। মুদ্রার পতন এবং দ্রুত ক্রমবর্ধমান মূল্যের বিরুদ্ধে দোকানদাররা প্রথমে বিক্ষোভে সামিল হয়। নতুন বছরের শুরুতেই বিক্ষোভ দেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস বিক্ষোভ দমনে রাস্তায় নামে। লর্দেগান, কুহদাশত এবং ইসফাহানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এই তিনটি শহরেই মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস অনুমোদিত ফার্স সংবাদ সংস্থা এবং অধিকার গোষ্ঠী হেঙ্গাও পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লর্দেগানে হতাহতের কথা জানিয়েছে। কুহদাশতে কমপক্ষে একজন এবং ইসফাহান প্রদেশে একজনের মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে। বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফার্স জানিয়েছে যে, লর্দেগানে নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ২ জন নিহত হয়েছে। হেঙ্গাও জানিয়েছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছে। বিপ্লবী গার্ড ঘোষণা করেছে, কুহদাশতে তাদের সহযোগী বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক আধাসামরিক ইউনিটের একজন সদস্য নিহত এবং আরও ১৩ জন আহত হয়েছে। নিহত বাসিজ আধাসামরিক সদস্যের নাম আমিরহোসাম খোদায়ারি ফারদ। তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। ইসফাহান প্রদেশেও একজন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। দক্ষিণ ফার্স প্রদেশের মারভদাশতেও বিক্ষোভ হয়েছে। হেঙ্গাও কেরমানশাহ, খুজেস্তান এবং হামেদান প্রদেশে বিক্ষোভকারীদের আটকের খবর দিয়েছে।
ইরানের অর্থনীতির এই পতনের জন্য দায়ী পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞা। যার ফলে ইরানের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ডিসেম্বরে মুদ্রাস্ফীতি ৪২.৫% এ পৌঁছেছে। জুনে ইজরায়েলি এবং মার্কিন বিমান হামলা ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো এবং সামরিক নেতৃত্বকে আরও চাপে ফেলেছে।
তেহরান বিক্ষোভের জবাবে দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রেখে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা বসার প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি বৃহস্পতিবার বলেছেন যে, কর্তৃপক্ষ ট্রেড ইউনিয়ন এবং বণিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় অংশ নেবে। যদিও আরও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অনুগত এবং ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবক আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ, কুহদাশতের বিক্ষোভের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল। গার্ডরা জড়িতদের বিক্ষোভের পরিবেশের সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ করেছে। ইরানের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায়ী, দোকান মালিক এবং শিক্ষার্থীরা কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভে সামিল হয়েছে। যার ফলে প্রধান বাজারগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে ছুটি ঘোষণা করে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। যার ফলে দেশের বেশিরভাগ অংশ কার্যকরভাবে অচল হয়ে পড়ে।
ইরানের আব্দুর রহমান বোরোমান্ড সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোয়া বোরোমান্ড বলেছেন, মুদ্রার মূল্য হ্রাস এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর এর প্রভাবের কারণেই এই বিক্ষোভ চলছে। তিনি বলেন, ‘ইরানিরা ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করছে এবং তাদের জীবনযাত্রার অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতির কোন আশা নেই। তারা রাজ্যের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি এবং দেশের অভ্যন্তরে দুর্দশা সৃষ্টিকারী নীতি নিয়ে ক্ষুব্ধ। সরকার বিরোধী যে কোনও বিক্ষোভকে রাষ্ট্র অবৈধ বলে মনে করে এবং আইনটি আসলে আইনি প্রতিবাদের জন্য জায়গা উন্মুক্ত করে না। এই কারণেই জনরোষ এবং মারাত্মক দমন-পীড়ন দেখা যাচ্ছে।’