ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউ–র পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস বৃহস্পতিবার এই ঘোষণা করেছেন। তাঁর যুক্তি, আইআরজিসি সাম্প্রতিককালে ইরানে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নৃশংস দমনপীড়ন চালিয়েছে। সেই দমনপীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এর ফলে ইইউ–র পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ব্রাসেলসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার পথে ক্যালাস বলেন, ‘এখন আইআরজিসি–কে আল–কায়দা, হামাস এবং দায়েশের মতো একই শ্রেণীতে দেখা হবে। যদি কেউ সন্ত্রাসীর মতো আচরণ করে, তাহলে তাদের সঙ্গেও সন্ত্রাসীর মতো আচরণ করা উচিত।’ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি, প্রসিকিউটর জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ এবং বিচারক ইমান আফশারিসহ ১৫ জন ইরানি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ক্যালাস দাবি করেছেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ আইআরজিসি–কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার পক্ষে সায় দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইরানের শহরগুলিতে রাস্তায় নেমে আসা বিক্ষোভকারীদের ওপর নৃশংস দমনপীড়নের খবরের প্রতিক্রিয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই বিক্ষোভে প্রায় ৬,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। ইইউ–র ২৭টি সদস্য রাষ্ট্র আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে।’
আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা ইউরোপীয় দেশগুলির অবস্থানের ক্ষেত্রেও একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ফ্রান্স এবং ইতালির মতো দেশগুলি, যারা পূর্বে এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিল, তারাও এই সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বুধবার ফ্রান্স তালিকাভুক্তির বিরোধিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ইতালি এবং স্পেন আইআরজিসি–র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছে।
আইআরজিসি বা ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস, ইরানের সামরিক বাহিনীর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে রক্ষা করা, যা শিয়া ধর্মগুরুদের তত্ত্বাবধানে ছিল। পরে এটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৮০–র দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এর শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়। ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের প্রায় ১,৯০,০০০ সক্রিয় সৈন্য রয়েছে। রিজার্ভ বাহিনীসহ এর শক্তি প্রায় ৬,০০,০০০।
এই সংস্থাটি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলিকেও সমর্থন করে। ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে আইআরজিসি–র বাসিজ বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের গুলি চালাচ্ছে এবং মারধর করছে এমন ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডের লেইন ইইউ–র সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন।
ইরানে ১৮ বছর বয়সের পর তরুণদের জন্য সামরিক পরিষেবা বাধ্যতামূলক হওয়ায় আইআরজিসি–র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জটিল। অনেকে চাপের মুখে আইআরজিসি–তে যোগ দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে বিপ্লবী গার্ডকে একটা সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একই পথে হাঁটার জন্য চাপ দেয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইইউ–র এই সিদ্ধান্তকে একটা কৌশল বলে অভিহিত করেছেন।
আইআরজিসি–কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং বিদ্বেষপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলি শাসনব্যবস্থার আধিপত্যবাদী এবং অমানবিক নীতির কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে ইইউ এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, আইআরজিসি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা সম্পূর্ণ ভুল এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে নেওয়া সিদ্ধান্ত।