দীর্ঘ ১৭ বছর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ফিরছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান। গোটা দেশ যখন হিংসতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হচ্ছে, উগ্র ইসলামী গোষ্ঠীগুলি তাণ্ডব চালাচ্ছে, সেই পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারির সাধারন নির্বাচনের আগে এক বড় রাজনৈতিক ঘটনা হল তাঁর দেশে ফেরা। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে এক রাজকীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজনের অনুমতি পেয়েছে বিএনপি।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানকে জেলে যেতে হয়। ১৮ মাস জেলে কাটানোর পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান। তারপর তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। ২০০৮ সালে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই তিনি বিদেশে বসবাস করছেন। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি। তাঁর সামনে দেশকে নতুন দিশা দেখানোর সুযোগ রয়েছে। কারণ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি এখনও পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে। বড় ধরনের কোনও বিপর্যয় না ঘটলে নির্বাচনের বিএনপি–র জয়ের সম্ভাবনা বেশি। তবে অনেক কিছুই নির্ভর করছে বাংলাদেশের মৌলবাদী দলগুলির ওপর। শোনা যাচ্ছে, জামায়াত–ই–ইসলামীর ভেতরে ভেতরে চায় না বিএনপি ক্ষমতায় আসুক।
চলতি বছরের মে মাসে তারেক রহমান নির্বাচন এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্র নীতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অধীনে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি কী হবে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, পাকিস্তান কিংবা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চাইবে না, বরং বাংলাদেশকে প্রথমে রাখবে।
নির্বাচিত ম্যান্ডেট ছাড়াই মহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের জন্য যে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছেন, তার থেকে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে ইউনূস সম্পূর্ণ বিপরীত পথ বেছে নিয়েছেন। হাসিনা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং চীন ও ভারতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। মহাম্মদ ইউনূস ভারত ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিনিময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে কথা বলেছেন।
তারেক রহমানের বিএনপি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাঁর মতে, হাসিনার শাসনকালে গণতন্ত্রের পতন হয়েছিল। তবে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গেও বেশ কয়েকটি বিষয়ে বিএনপি–র মতপার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন যে, বিএনপি–র চাপের মুখে মহাম্মদ ইউনূস ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
বিএনপি এবং জামায়াত–ই–ইসলামীর বাংলাদেশ আগেও জোটবদ্ধ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সহিংস রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রভাব সম্পর্কে তারেক রহমানের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। শেখ হাসিনার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে মহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করায় তারেক রহমানের বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বাংলাদেশে বিকল্প শক্তি তৈরির করার জন্য জামায়াত–ই–ইসলামীর বাংলাদেশকে মূলধারায় ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে উগ্র ইসলামী শক্তিগুলি সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইউনূসের ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে জামায়াত–ই–ইসলামীর কোনও আপত্তি নেই। তাদের নেতারা ঐতিহ্যবাহী কোনও নির্বাচনী জোটে যোগদানের ব্যাপারটি অস্বীকার করেছে। যার ফলে আসন্ন নির্বাচন বিএনপি এবং অন্যান্য শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতায় পরিণত হতে চলেছে।
জামায়াত–ই–ইসলামী আরও সতর্ক করে দিয়েছে যে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট দেশকে নির্বাচনী গণহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু ইউনূস সরকার একই দিনে গণভোট ঘোষণা করেছে, যা জামায়াত-ই-ইসলামীর জন্য নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের দায়িত্ব হল দেশকে ঐক্যবদ্ধ করা যদি তাঁর দল নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং প্রধানমন্ত্রী হয়। তারেক রহমান ইতিমধ্যেই প্রচারের রূপরেখা তৈরি করেছেন এবং একাধিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন যা বিএনপি নির্বাচিত হওয়ার পর বাস্তবায়ন করবে।
বগুড়া–৭ (গাবতলী–শাজাহানপুর) আসনের জন্য বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার পক্ষে ইতিমধ্যেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। আর বগুড়া–৬ (সদর) আসন থেকে তারেক রহমান লড়াই করবেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া বগুড়া–৬ আসন থেকে প্রতিটি নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন।