বিয়ের পর থেকে স্বামী ও পরিবারে হাতে অকথ্য অত্যাচার। একসময় আত্মহত্যা করার কথাও ভেবেছিলেন। শেষপর্যন্ত চরম সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসেন। গার্হস্থ্য জীবনের সহিংসতার শিকার হয়েও দারুণভাবে খেলার মূলস্রোতে ফিরে এসেছিলেন। আর এই ব্যাপারে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দ্বিতীয় স্বামী। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতে ইতিহাস তৈরি করলেন শর্মিলা ধনকড়। ৯.৮১ মিটার থ্রো করে সোনা জিতেছেন ধনকড়। মহিলাদের প্যারা শটপাটে এফ৫৭ ইভেন্টে প্রথম প্রথম ভারতীয় হিসেবে সোনা জিতেছেন এই প্যারা অ্যাথলিট। মীরাবাই চানুর পর তাঁর হাত ধরেই এল স্বর্ণপদক।
হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে গ্লাসগো ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন পর্যন্ত শর্মিলা ধনকড়ের যাত্রা ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। এর মধ্যে রয়েছে পোলিওতে আক্রান্ত হওয়া থেকে শুরু করে গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হওয়ার মতো বেদনাদায়ক কাহিনী। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তিনি নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু কথায় আছে, জীবন অবশ্যই প্রত্যেককে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়।
হরিয়ানার চিত্রৌলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শর্মিলা ধনকড়। তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। মা অন্ধ, বাবা কৃষক। হরিয়ানার যে এলাকায় তাঁরা বাস করতেন, সেই এলাকাটি খরাপ্রবণ হওয়ায় ফলন কম হত। মাত্র ২ বছর বয়সে শর্মিলার বাঁ পায়ে পোলিও হয়। এটাই তাঁর প্রতিকূল জীবনের শেষ ছিল না, এটা ছিল তাঁর মর্মান্তিক কাহিনীর সূচনা মাত্র।
অনেক কষ্ট করে ১৮ বছর বয়সে শর্মিলার বিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। কিন্তু তাঁর স্বামী ও পরিবার শর্মিলার জীবনকে নরক বানিয়ে তুলেছিল। তিনি যৌতুক ও গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন। নিত্যদিনের নির্যাতন ও মারধর তাঁর জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে করতে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, একসময় আত্মহত্যা করার কথা ভাবতে শুরু করেন শর্মিলা। কিন্তু দুই মেয়ের কথা ভেবে শেষপর্যন্ত পিছিয়ে আসেন। অবশেষে তিনি তাঁর প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দেন।
বিবাহবিচ্ছেদের পর শর্মিলা ধনকড়কে শুধু নিজের কথাই নয়, দুই মেয়েকে বড় করার চিন্তাও করতে হয়েছিল। তিনি তাঁর বাবা–মায়ের বোঝা হতে চাননি। তাই ছোটখাটো কাজ করতে শুরু করনে। ২৮ বছর বয়সে আবার বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। পুনরায় বিয়ে করার পর তাঁর জীবনে নতুন মোড় আসে। শর্মিলার দ্বিতীয় স্বামী তাঁর জীবন বদলে দেন। দ্বিতীয় স্বামী অজিত সিং তাঁকে প্যারা অ্যাথলেটিক্সে কেরিয়ার গড়ার পরামর্শ দেন।
অজিত সিংয়ের পরামর্শ মেনে ধনকড় প্যারা অ্যাথলিট হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রশিক্ষণের জন্য তিনি রাও তুলারাম স্টেডিয়ামে যান। সেখানে প্রাক্তন প্যারা অ্যাথলিট টেকচাঁদের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। ৩৪ বছর বয়সে শর্মিলা প্যারা অ্যাথলেটিক্সে অভিষেক করেন। ৪ বছর আগে বার্মিংহামে কমনওয়েলথ গেমসে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। সেখানে তিনি চতুর্থ হয়ে অল্পের জন্য পদক হাতছাড়া করেন। তবে, নিজের দ্বিতীয় কমনওয়েলথ গেমস, গ্লাসগো ২০২৬–এ সোনা জিতে ইতিহাস গড়লেন। মহিলাদের প্যারা শটপাটে এফ৫৭ ইভেন্টে তিনিই প্রথম সোনাজয়ী ভারতীয়।