ট্রেন্ডিং

The Ladakh trip begins

‘‌‘‌হাওয়া পাতলা, রোমাঞ্চ ঘন!’‌’

লেখক পরিচিতি:‌ সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম বিহারের সমস্তিপুরে ১৯৫৩–তে। ভ্রমণ আর লেখা, এই দুই যেন হৃদস্পন্দনের মতোই জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনে। শৈশব থেকেই বইয়ের পাতায় চোখ রেখে যে যাত্রা শুরু, তা কখন যে বাস্তবের পথে পথে ছড়িয়ে পড়ল, নিজেই বুঝে উঠতে পারেননি। কলকাতায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পড়তে এসে ভাগ্য নিয়ে যায় সাহিত্যিকদের সান্নিধ্যে। আশাপূর্ণা দেবী, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের মতো গুণীজনদের সংস্পর্শে সেই লেখালেখির আলো প্রথমবার হৃদয়ে ঝলমল করে ওঠে। পেশাগত জীবন তাঁকে নিয়ে যায় দুবাইয়ে, দীর্ঘ ১৪ বছরের প্রবাসজীবন। কর্মব্যস্ততার ফাঁকেও প্রতিটি ছুটি, প্রতিটি অবসরে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন, নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন আকাশ খুঁজে। সময়ের সাথে সাথে নিজের অজান্তেই সেই অভিজ্ঞতাগুলো জমা হতে থাকে আত্মার ডায়েরিতে। জন্ম নেয় তাঁর প্রথম ভ্রমণগ্রন্থ ‘এগারোটি দেশের বারোটি গল্প’ (২০১৯)।

লাদাখের অপরূপ দৃশ্য।

সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: নভেম্বর ২৯, ২০২৫
Share on:

পর্ব – এক

নিশ্বাস বন্ধ ! না না, দম বন্ধ নয়–এ তো লাদাখ ট্রিপের শুরু! আবার নতুন গন্তব্য, নতুন চ্যালেঞ্জ আর একগুচ্ছ উত্তেজনা। আড়াই হাজার কিলোমিটার রোলারকোস্টার–যাত্রা, ১৮টি গন্তব্য, আর সাথে বেড়েই চলেছে উচ্চতা–একটু আগে ১১ হাজার, এরপর ১২, তারপর ১৩, হুট করে ১৪, তারপরে ১৬ আর অবশেষে ১৯ হাজার পেরিয়ে গিয়ে মনে হলো, “উঁই মা, এটাতো প্লেন না নিয়েও মাউন্ট এভারেস্টের আত্মীয় হবার চেষ্টায় !”

হ্যাঁ, ১৩ জনের আমাদের এই সাহসী (বা বলতে পারেন কিছুটা পাগল) দল, সতেরো দিনের অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়লো একরাশ উত্তেজনা, একটা ফাঁকা সিলিন্ডার আর ব্যাগভর্তি ওষুধপত্র নিয়ে।

সবার মুখে তখন একটাই ভাব, “এবার কিছু একটা করে ফেলতেই হবে !” কী করে ফেলবো, সেটা অবশ্য তখনও স্পষ্ট নয়। তবে টার্গেট কিন্তু একদম পরিষ্কার, জগৎ–খ্যাত, দম আটকে দেওয়া, মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া, অক্সিজেন চুষে নেওয়া Umling La পাসে চড়তে হবে! ১৯,০২৪ ফুট! শুনলেই গায়ে কাঁটা দেয় আর মন বলে, “তোর পেট ঠিক আছে তো?”

অবশ্য ট্র্যাভেল মানেই তো একটু পাগলামি, একটু গায়ে কাঁটা, আর বাক্সভর্তি গল্প। এই যাত্রায় সেটা পুরোমাত্রায় মজুত! ভয় ছিল, কিন্তু তৃপ্তির হাঁসি তার থেকেও বড়, আহা, জীবন! বলতেই হয়, এই যাত্রা ছিল ‘হাই’তে ওঠার একেবারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, এক্সট্রা অক্সিজেন, মাউন্টেন ম্যাজেস্টি আর মাথা ঘোরানো মুহূর্তে ঠাসা!

২৯শে জুন ২০২৫, সকাল নয়, একেবারে রাতের শেষ প্রহর! ঘড়ির কাঁটা তখনও ঘুমঘুম করছে, আর আমাদের ১৩ জনের যাত্রাদল মুম্বই এয়ারপোর্টে ঢুকতেই যেন টার্মিনালটা একটু নড়ে চড়ে উঠল। সুমিত–শ্রাবনী, তনিমা, সুমন্ত–শীলা (মানে আমরা), রুদ্র–শর্মিষ্ঠা, সুবীর–মানসী, সুশান্ত–ভ্রমর, সোমালি আর নীলাঞ্জনা, সবাই একসাথে! তালগোল পাকানো নাম শুনে মনে হতেই পারে এটা কোনও কবি সম্মেলন, কিন্তু না! এ এক দুর্ধর্ষ পাহাড়ি যাত্রার সূচনা!

এয়ারপোর্টে ঢুকেই শুরু হল আমাদের প্রথম যুদ্ধ, ‘বোর্ডিং পাস ও লাগেজ বনাম সেলফি’। কেউ ব্যাগ ছাড়ছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ আবার ক্যামেরা দেখে পাউডার দিচ্ছে। তারপর সবাই গটগটে ঢুকে পড়লাম লাউঞ্জে। খাওয়া তো হবেই, ভেতরে ‘দু টাকার’ খাওয়া (মানে সেই ক্রেডিট / ডেবিট কার্ড লাউঞ্জ)! কে কার প্লেট ভারি করে, কে কেক গুজে নিচ্ছে, কে চা খাচ্ছে তাতে বিস্কুট ডুবিয়ে, একেবারে মহাভোজ।


এরপরে ঢুকলাম বিমানে, ক্লান্ত শরীর, আধঘুম চোখে। গতরাতের ‘ইন্স্যুরেন্স নাকি ইনস্যুরেন্স’, ‘১৫ কেজি মানে কত জিনিস ফিটানো যায়’, কত কাপড় দরকার না হলেও পরে নিতে হয় ব্যাগের ওজন কমানোর তালে, ‘জিন্স নাকি থার্মাল’ এসব নিয়ে যুদ্ধ করেই তো রাত পার! তাই সিটে বসেই সব বীরঘোমটা, পাইলটের ‘গুড মর্নিং’–কে পাত্তা না দিয়ে সবাই স্বপ্নলোকে।

কখন যে শ্রীনগরে নামলাম বুঝতেই পারিনি। চোখ খুলে দেখি এয়ারপোর্ট সাতাশ বছর আগের সেই ছোট্ট দালান আর নয়, এখন একেবারে পাটচালান মার্কা চকচকে বিল্ডিং। কিন্তু বাইরে পা দিয়েই প্রথম ধাক্কা, মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই! সবার চোখ কোটরের বাইরে, মুখে শোকের ছায়া, “ওটিপি আসবে না মানে খাবার অর্ডার কিভাবে করব?” কেউ ফিসফিস করে বলছে, “আমি তো আরেকটা ওয়ানটাইম পাসওয়ার্ড মনে রাখতে পারব না রে!”

পরে জানা গেল, লাদাখ ও কাশ্মীরে প্রিপেইড সিম চলবে না, শুধু পোস্টপেইড! কারণ সুরক্ষা, মানে, আমরা সবাই সিম বিহীন সন্ন্যাসী! এখন ভরসা একটাই, হোটেলের Wi-Fi, আর সেটাও যদি চলে না যায়।

ততক্ষণে দলের বাকি তিন সদস্য, সুমিত, শ্রাবনী আর নীলাঞ্জনা, পরের ফ্লাইটে এসে আমাদের মিশন কমপ্লিট করলেন। বাহিনী পূর্ণ, সেনারা প্রস্তুত, এবং টেম্পো ট্র্যাভেলার এসে গাড়ির মাথায় ব্যাগ তুলে হাসিমুখে বলল, “চলুন দিদি–বাবুরা, অভিযান শুরু হোক!”

পেছনের ব্যাকপ্যাক ঠাসা, সামনে রোলারকোস্টার রাস্তা, আর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, "এই যাত্রার শেষে কি সত্যিই শুধু পাহাড় থাকবে, না আমরা নিজেরাই একটু বদলে যাব?” তবে তার আগে... Wi-Fi পাওয়া যাবে তো?

ক্রমশ


আরও পড়ুনঃ

অন্যান্য খবর

Inside Bangla is a comprehensive digital news platform. This web portal started its humble journey. Its courageous journalism, presentation layout and design quickly won the hearts of people. Our journalists follow the strict Journalism ethics.

Copyright © 2026 Inside Bangla News Portal . All Rights Reserved. Designed by Avquora