‘শোলে’ সিনেমায় ‘বীরু’কে রেখে মারা গিয়েছিলেন ‘জয়’। বাস্তব জীবনে উল্টো ছবি। ‘জয়’কে রেখে চলে গেলেন ‘বীরু’। মারা গেলেন জনপ্রিয় অভিনেতা ধর্মেন্দ্র। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। সোমবার নিজের বাড়িতেই তিনি মারা যান। রেখে গেলেন স্ত্রী হেমা মালিনী এবং ছয় সন্তান, সানি দেওল, ববি দেওল, এশা দেওল, অহনা দেওল, অজিতা দেওল এবং বিজেতা দেওলকে। মুম্বইয়ের ভিলে পার্লের মহাশ্মশানে ধর্মেন্দ্রর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। হাজির ছিলেন অমিতাভ বচ্চনসহ বলিউডের অসংখ্য অভিনেতা–অভিনেত্রী।
বেশ কিছুদিন আগেই শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে এই প্রবীণ অভিনেতাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। প্রথমে তাঁকে নিয়মিত চেকআপের জন্য ভর্তি করা হয়। কিন্তু বয়সজনিত জটিলতার কারণে তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকরা ধর্মেন্দ্রকে তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউতে স্থানান্তরিত করেন। ১১ নভেম্বর গুজব উঠেছিল, মারা গেছেন ধর্মেন্দ্র। কিন্তু সুস্থ হয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। বাড়িতে বেশ ভালই ছিলেন। কিন্তু সোমবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের লুধিয়ানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ধর্মেন্দ্র। তাঁর পুরো নাম ছিল ধরম সিং দেওল। বাবা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে একবার একটা সিনেমা হলে সুরাইয়ার ‘দিল্লাগি’ সিনেমা দেখেছিলেন। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে গিয়ে ধর্মেন্দ্র টানা ৪০ দিন ধরে সিনেমাটি দেখেছিলেন। এরপর থেকেই তিনি অভিনয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই সময় ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিন নতুন প্রতিভার খোঁজ করছিল। জানতে পেরে আবেদন করেন ধর্মেন্দ্র। তাঁকে নির্বাচন করা হয়। ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে ধর্মেন্দ্রর জীবনে। সুযোগ পেয়ে যান চলচ্চিত্র জগতে। এরপর তিনি বছরের পর বছর ধরে হিন্দি সিনেমা জগতে রাজত্ব করেন।
১৯৬০ সালে অর্জুন হিঙ্গোরানির ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্র কেরিয়ার শুরু করেন। অ্যাকশন থেকে কমেডি, সব ধরণের অভিনয়ে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। ধর্মেন্দ্রের চলচ্চিত্র কেরিয়ার একটা অ্যালবাম, যার প্রতিটি পৃষ্ঠা সৌন্দর্য এবং সংগ্রামে ভরা। ১৯৭০-এর দশকে তিনি অ্যাকশন হিরো হিসেবে এতটাই বিখ্যাত হয়ে ওঠেন যে, সবাই তাঁকে ‘হি ম্যান’ নামে ডাকত।
১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শোলে’ বাস্তব এবং রিল উভয় জীবনেই ধর্মেন্দ্রর চলচ্চিত্র জগতে অন্যমাত্রা নিয়ে এসেছিল। বীরুর ভূমিকায় তার সংলাপ, ‘বাসন্তী, ইন কুত্তো কা সামনে মত নাচনা’, আজও মানুষের মুখে মুখে রয়ে গেছে। এই ছবির মাধ্যমেই তিনি চিরকালের জন্য তাঁর ‘বাসন্তী’ খুঁজে পেয়েছিলেন। চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের আগে ১৯৫৪ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রকাশ কাউরকে বিয়ে করেন। পরে অভিনয় জগতে আসার পর অভিনেত্রী হেমা মালিনীর প্রেমে পড়েন। পরে তাঁকে বিয়ে করেন।
১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সীতা অর গীতা’ ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ধর্মেন্দ্র। হেমা মালিনীর সঙ্গে তাঁর অনস্ক্রিন রসায়ন দিয়ে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে রাজত্ব করতে শুরু করেছিলেন। এই ছবিটি কেবল হিটই ছিল না, ধর্মেন্দ্রকে ‘দ্বৈত চরিত্রের রাজা’ হিসেবেও প্রমাণ করেছিল। তাঁর কমেডি ছবি ‘চুপকে চুপকে’ (১৯৭৫) ব্যাপক হিট হয়েছিল। অমিতাভ, জয়া বচ্চন এবং শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর দুর্দান্ত জুটি এখনও মানুষকে হাসায়। ‘রাম বলরাম’ (১৯৭৬)–এর মতো ছবিতে তিনি সাধারণ মানুষের প্রিয় হয়ে ওঠেন। ৩০০ টিরও বেশি ছবিতে কাজ করা ধর্মেন্দ্র প্রতিটি চরিত্র দিয়ে মানুষের মন জয় করেছিলেন।
২০১২ সালে পদ্মভূষণে ভূষিত হন ধর্মেন্দ্র। তিনি ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারেও ভূষিত হয়েছেন। চলচ্চিত্রের বাইরেও ধর্মেন্দ্রর জীবন অসাধারণ। ১৫ তম লোকসভা নির্বাচনে রাজস্থানের বিকানির আসন থেকে জিতে সাংসদ হয়েছিলেন। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি চলচ্চিত্র জগতে সক্রিয় রয়েছেন। প্রয়াত এই অভিনেতার দুটি ছবি এখনও মুক্তি পায়নি। ‘ইক্কিস’ ছাড়াও, ধর্মেন্দ্রকে ‘ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া ফির সে’ এবং ‘আপনে ২’ ছবিতেও দেখা যাবে। তাঁর শেষ অন–স্ক্রিন উপস্থিতি ‘ইক্কিস’ ছবিতে, যা ২৫ ডিসেম্বর মুক্তি পাবে। ছয় দশকের কর্মজীবনে তিনি ‘ইয়াদন কি বারাত’, ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’, ‘নৌকার বিবি কা’, ‘ফুল অউর পাত্তাহায়’, ‘অন্যদের মধ্যে’–র মতো পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। বলিউডের হিম্যান হিসেবে পরিচিত ধর্মেন্দ্র ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এক অসাধারণ সিনেমার উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।
৮৯ বছর বয়সেও ধর্মেন্দ্র সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ছিলেন। প্রায়শই তিনি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং জৈব জীবনযাত্রার প্রচারমূলক ভিডিও শেয়ার করতেন। অনেক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তাঁকে ট্র্যাক্টর চালানো, খামারের যত্ন নেওয়া এবং তাঁর ভক্তদের সহজ জীবনযাপনের পাঠ এবং কৃষিকাজের টিপস দেওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়েছে।